ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬

দিল্লিতে বিমসটেকের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে যাচ্ছেন না বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

প্রতিষ্ঠার প্রায় তিন দশক পর আগামী মঙ্গলবার প্রথমবারের মতো বৈঠকে বসছেন বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের সাত দেশের আঞ্চলিক জোট বিমসটেকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বৈঠকটি হবে। তবে এতে যোগ দিচ্ছেন না বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তার পরিবর্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল যোগ দেবে।ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ ছাড়া অন্য ছয় সদস্যদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন। মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের আগের দিন, অর্থাৎ ১২ অক্টোবর প্রথমবারের মতো আলোচনায় বসবেন সদস্যদেশগুলোর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা।বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দিল্লি সফরে না যাওয়ার বিষয়ে সরকারের একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্কের টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।


এর আগে গত সেপ্টেম্বরে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে যাননি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিমসটেকের বর্তমান সভাপতি হিসেবে তাকে ওই অধিবেশনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল ভারত। তবে বাংলাদেশ সরকার জানিয়েছিল, আমন্ত্রণটি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বিমসটেকের সভাপতি হিসেবে পাঠানো হয়েছিল।


দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সহযোগিতার সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করার লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালের ৬ জুন ব্যাংকক ঘোষণার মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করে বিমসটেক। এর সাত সদস্যদেশ হলো বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, নেপাল ও ভুটান। এই জোটের সচিবালয় ঢাকায়। ২০২৫ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ বিমসটেকের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করে।


সরকারি চিঠিতে চারজনকে মনোনয়ন


বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকে না যাওয়ার বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক চিঠিতেও প্রতিফলিত হয়েছে। ৪ অক্টোবর বিমসটেক সচিবালয়ে পাঠানো ওই চিঠিতে ১২ ও ১৩ অক্টোবরের বৈঠকের জন্য চার সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নাম জানানো হয়। তালিকায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নাম নেই। বিমসটেক সচিবালয়ে পাঠানো চিঠিতে জানানো হয়েছে, প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে থাকছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী।


এদিকে ৫ অক্টোবর সদস্যদেশগুলোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো বিমসটেক সচিবালয়ের একটি জরুরি চিঠি থেকেও বৈঠকের প্রস্তুতি সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেছে।


ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, ৪ অক্টোবর বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের মনোনয়ন পাঠিয়েছে। ৫ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশ, ভুটান ও শ্রীলঙ্কার মনোনয়ন পাওয়া গেছে। বাকি তিন দেশ মিয়ানমার, নেপাল ও থাইল্যান্ডকে দ্রুত প্রতিনিধিদের নাম পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়। এর আগে ২ সেপ্টেম্বর সদস্যদেশগুলোর কাছে মনোনয়ন চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছিল বিমসটেক সচিবালয়।


দিল্লির বৈঠকে থাকছেন যারা


বিমসটেক সচিবালয় ও দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। এর আগের দিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বৈঠক পরিচালনা করবেন ভারতের স্বরাষ্ট্রসচিব গোবিন্দ মোহন।


অন্য দেশগুলোর পক্ষে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে ভুটানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুংতেন দর্জি, মিয়ানমারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেনারেল কো কো ও, নেপালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুদান গুরুং, শ্রীলঙ্কার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চন্দনা আবেরত্নে এবং থাইল্যান্ডের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সংসাক থংস্রির।


আলোচনায় সন্ত্রাসবাদ ও আন্তসীমান্ত অপরাধ


সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দিল্লির বৈঠকে এ অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদ ও আন্তসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় সহযোগিতা জোরদারের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। মানব পাচার, মাদক পাচার, অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধের পাশাপাশি সদস্যদেশগুলোর আইন প্রয়োগকারী ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।


গত ২৮ ও ২৯ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে অনুষ্ঠিত বিমসটেকের সন্ত্রাসবাদ দমন ও আন্তর্জাতিক অপরাধবিষয়ক যৌথ কার্যকরী দলের একাদশ বৈঠকের প্রতিবেদন ও সুপারিশও এবারের আলোচনায় গুরুত্ব পাবে বলে জানা গেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২৯ সেপ্টেম্বরের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ওই বৈঠকে বাংলাদেশসহ সাত সদস্যদেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সভাপতিত্ব করেন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সন্ত্রাসবাদ দমন) সুহেল এজাজ খান।


বৈঠকে এ অঞ্চলের প্রচলিত নিরাপত্তা হুমকির পাশাপাশি নতুন ধরনের অপ্রচলিত নিরাপত্তা হুমকি নিয়েও আলোচনা হয়। সন্ত্রাসবাদ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ মোকাবিলায় সহযোগিতা বাড়াতে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়।


এ ছাড়া মানব পাচার, মাদকদ্রব্য ও মাদক তৈরির রাসায়নিকের অবৈধ বাণিজ্য প্রতিরোধ, অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন বন্ধ, আইনি ও আইন প্রয়োগসংক্রান্ত সহযোগিতা এবং উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় গঠিত উপদলগুলোর প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা হয়।


আট বছর আগে সিদ্ধান্ত, প্রথম বৈঠক এবার


বিমসটেকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের সিদ্ধান্ত হয়েছিল আট বছর আগে। ২০১৮ সালের ৩০ ও ৩১ আগস্ট নেপালের কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত জোটের চতুর্থ শীর্ষ সম্মেলনে সদস্যদেশগুলোর নেতারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে নিয়মিত বৈঠক আয়োজনের বিষয়ে একমত হন।


কাঠমান্ডু ঘোষণায় সদস্যদেশগুলোর আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, গোয়েন্দা সংস্থা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা ও সমন্বয় জোরদারের অঙ্গীকার করা হয়। একই সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের পর্যায়ের বৈঠক অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত হয়।


তবে ওই সিদ্ধান্তের পরে এত দিনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের কোনো বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি। ২০২৫ সালের এপ্রিলে ব্যাংককে বিমসটেকের ২০তম মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক আয়োজনের ধারণাপত্র অনুমোদন করা হয়। এর প্রায় দেড় বছর পর দিল্লিতে প্রথম বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

ads
ads
ads

Our Facebook Page

↑